প্রবাসীদের সমর্থন আদায় না করতে পারলে সরকার চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে
বাংলাদেশের অর্থনীতি, রাজনীতি ও সামাজিক কাঠামোয় প্রবাসীদের অবদান অনস্বীকার্য। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী রাখা থেকে শুরু করে গ্রামীণ অর্থনীতিতে প্রাণসঞ্চার—সবখানেই প্রবাসীদের ঘামঝরা উপার্জনের ছাপ স্পষ্ট। তাই নতুন সরকারের জন্য প্রবাসীদের আস্থা ও সমর্থন অর্জন কেবল কূটনৈতিক অগ্রাধিকার নয়, এটি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতারও পূর্বশর্ত।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দায়িত্ব গ্রহণের পর বিভিন্ন ক্ষেত্রে সংস্কার ও সুশাসনের অঙ্গীকার করেছেন। কিন্তু প্রবাসীদের প্রত্যাশা পূরণে দৃশ্যমান পদক্ষেপ না এলে সেই অঙ্গীকার পূর্ণতা পাবে না। কারণ, প্রবাসীরা শুধু রেমিট্যান্স প্রেরণকারী নন—তাঁরা দেশের অনানুষ্ঠানিক ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের প্রতিনিধিও বটে।
দীর্ঘদিন ধরে প্রবাসীরা নানা সমস্যার কথা বলে আসছেন—বিদেশে শ্রমিক নির্যাতন, চুক্তি লঙ্ঘন, উচ্চ রিক্রুটিং খরচ, বিমানবন্দরে হয়রানি, প্রবাসী কল্যাণ সেবায় জটিলতা এবং দেশে বিনিয়োগে অনিশ্চয়তা। এসব সমস্যা সমাধানে কার্যকর উদ্যোগ না থাকলে তাঁদের হতাশা বাড়বে, যা রেমিট্যান্স প্রবাহেও প্রভাব ফেলতে পারে।
বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতা বাড়ছে। দক্ষ জনশক্তি তৈরির মাধ্যমে নতুন নতুন শ্রমবাজারে প্রবেশ করা এখন সময়ের দাবি। কেবল অদক্ষ শ্রম রপ্তানি নয়, প্রযুক্তি, স্বাস্থ্যসেবা, প্রকৌশল ও তথ্যপ্রযুক্তি খাতে দক্ষ কর্মী পাঠানোর কৌশল গ্রহণ জরুরি। একই সঙ্গে প্রবাসীদের বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ, সহজ ব্যাংকিং সুবিধা এবং কর-প্রণোদনা নিশ্চিত করা গেলে অর্থনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে।
রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকেও প্রবাসীদের গুরুত্ব কম নয়। তারা দেশের নির্বাচনী রাজনীতিতে সরাসরি ভোট দিতে না পারলেও জনমত গঠনে এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে সরকারের ভাবমূর্তি নির্মাণে বড় ভূমিকা রাখেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁদের সক্রিয় উপস্থিতি দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও প্রভাব বিস্তার করে। ফলে তাঁদের আস্থা হারানো মানে একটি প্রভাবশালী শক্তিকে দূরে ঠেলে দেওয়া।
নতুন সরকারের জন্য তাই প্রয়োজন প্রবাসী-কেন্দ্রিক সমন্বিত নীতি—যেখানে সুরক্ষা, মর্যাদা, দক্ষতা উন্নয়ন ও বিনিয়োগ সুযোগ একসঙ্গে বিবেচনায় থাকবে। দূতাবাসগুলোর জবাবদিহি ও সেবার মান বাড়ানো, রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর ওপর কঠোর নজরদারি এবং প্রবাসী অভিযোগ নিষ্পত্তিতে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ—এসব পদক্ষেপ আস্থা ফিরিয়ে আনতে সহায়ক হতে পারে।
প্রবাসীরা শুধু অর্থ পাঠান না; তাঁরা আশা পাঠান, স্বপ্ন পাঠান, পরিবারের মুখে হাসি ফোটান। সেই স্বপ্ন যদি অবহেলায় ভেঙে যায়, তার অভিঘাত রাষ্ট্রের অর্থনীতি ও রাজনীতিতেও প্রতিফলিত হবে।
অতএব, প্রবাসীদের সমর্থন আদায় করতে না পারলে সরকার নিঃসন্দেহে বহুমুখী চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে। আর তাঁদের আস্থা অর্জন করতে পারলে সেটিই হতে পারে সরকারের শক্তির অন্যতম বড় ভিত্তি।

